চীন কী পারবে আমেরিকাকে পেছনে ফেলতে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, মানবকথা২৪, ৮ জুন ২০১৪


চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অন্যান্য জাতির সাথে দেশটির ক্রমবর্ধিষ্ণু ইতিবাচক সম্পর্ক ওয়াশিংটনে একটা উদ্বেগ তৈরি করেছে যে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে আমেরিকা এক নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখীন হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে যে এ বছরের শুরুতেই চীন ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে আমেরিকাতে ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর মানে এই যে আমেরিকা তার বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির মর্যাদা হারাবে, যে দেশটা ১৮৭৬ সালে স্বাধীনতার লাভের এক শতাব্দীর প্রাক্কালেই এক্ষেত্রে বৃটেনকে অতিক্রম করেছিল। আমেরিকার বেইজিং বিশ্লেষকরা প্রায়ই চীনের এ সফলতাকে তাদের বাজারমুখী ব্যবসায়িক নীতির ফল বলে মনে করেন এবং দেশটির বর্ধিষ্ণু সামরিক ব্যয় ও রাষ্ট্র কতৃক পরিচালিত সাইবার আক্রমণকে হুমকি হিসেবে দেখেন। এটা আসলে কোনো কাজে আসে না যখন আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে চীনের সামরিক নেতারা আমেরিকাকে ক্ষয়িষ্ণু জাতি হিসেবে বর্ণনা করেন এবং ইউক্রেন  সংকটে ওবামা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রিত আচরণকে দুর্বল ও অকার্যকর বলে মনে করেন। যাই হোক, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ওবামা প্রশাসনের নতুন কোনো শীতল যুদ্ধ শুরু করার দরকার নেই। কেননা, কোনো অবস্থাতেই বৈশ্বিক ক্ষমতা বলয় থেকে আমেরিকাকে সরানোর ক্ষমতা চীনের নেই, যেমনটা ছিল জাপান ও রাশিয়ার। এর আংশিক কারণ আমেরিকা চীনের চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সুবিধা ভোগ করে। অন্যদিকে চীনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে যা তাকে বৈশ্বিক ক্ষমতা বলয় থেকে কিছুটা পিছিয়ে রাখবে। এ সীমাবদ্ধতাগুলোর কারণে চীন ওয়াশিংটনে খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। এখানে চীনের পিছিয়ে থাকার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরা হলো-

ভৌগলিক সীমাবদ্ধতা
ভৌগলিক কারণে আমেরিকার মতো চীনের ভূখন্ড বৃদ্ধির সম্ভাবনা ক্ষীণ। চীনের পশ্চিমে রয়েছে অনুর্বর তিব্বতী মালভূমি ও গোবী মরুভূমি। দক্ষিণে হিমালয় পর্বতমালা ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে একটা বাধা সৃষ্টি করেছে। উত্তরে বিশাল এবং বিস্তৃত চারণভূমি রাশিয়ার সাথে বাফার অঞ্চল তৈরি করেছে। আর পূর্ব দিকে বিস্তৃত রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম মহাসমুদ্র (সাংহাই ও সান ফ্রান্সিসকোর মধ্যে ৬০০০ মাইল পানিপথ রয়েছে)। কাজেই দুর্ভাগা ভিয়েতনামিজ, যারা দক্ষিণ উপকূলীয় সমভূমির অংশীদার, এবং তাইওয়ানের উপর চায়নার ঐতিহাসিক দাবী ব্যতীত চায়নার আর কোনো যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনা নেই, যা থেকে চায়না নতুন কোনো ভূখন্ড পেতে পারে।

জনসংখ্যার গতিপ্রকৃতি
১৩০ কোটি জনসংখ্যা  নিয়ে চীন পৃথিবীর বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। যাই হোক ১৯৭৯ সালে এক সন্তান নীতি আরোপের পর এ জনসংখ্যার বয়স দ্রুতই বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে একটা স্থীর জনসংখ্যা বজায় রাখতে নারীপ্রতি ২.১ হারে বাচ্চা জন্ম দেওয়া দরকার। কিন্তু বর্তমানে চীনে প্রতি নারীর বাচ্চাদান ক্ষমতা ১.৬ যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এ জন্মহার এশিয়ার অন্যান্য জাতির তুলনায়ও বেশ কম। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের সম্প্রতি প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হযেছে যে কয়েক বছরের মধ্যে চায়নার কর্মক্ষম জনসংখ্যা একটা ঐতিহাসিক পর্যায়ে পৌঁছাবে তারপর ব্যাপকভাবে পড়তে শুরু করবে।


অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা
অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন তার এশিয়ান প্রতিবেশি দেশগুলোর মতো ব্যবসায়িক নীতি মেনে চলেছে। সিআইএর ২০১৪ সালের রিপোর্ট মতে, দেশটির জিডিপির এক চতুর্থাংশেরও বেশি পণ্য ও সেবা রপ্তানি তেকে আসে। সস্তা শ্রম ও বিদেশি বাজার চীনের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। তারপরও চীনের মাথাপিছু আয় ১০,০০০ ডলার যা আমেরিকার তুলনায় যথেষ্ট কম। তাছাড়া চায়না তার অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে বাজার ও বিনিয়োগকারীদের উপর এত বেশি নির্ভরশীল যে দেশটা আসলেই তার ব্যবসায়িক অংশীদারদেরকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারবে না।

রাজনৈতিক সংস্কৃতি
চীনে কমিউনিস্ট পার্টির একচেটিয়া ক্ষমতার কারণে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মৌলিক কোনো সংস্কারের কমই সুযোগ রয়েছে। দলের কর্মকর্তারা সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। ঘুষ, অর্থ আত্মসাৎ এবং সম্পদ চুরি মহামারি আকার ধারণ করেছে। গার্ডিয়ান পত্রিকা রিপোর্ট করেছে যে,লাখ লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে সেনাবাহিনীতে লোক নিয়োগ করা হচ্ছে যা দুর্নীতির দুষ্ট চক্র তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে  এই বছরের প্রথম তিন মাসেই আট হাজারের বেশি মামলা পড়েছে,  যা তদন্ত করা হচ্ছে। এই দুর্নীতি এমন একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির তৈরি করেছে যার কোনো সমাধান নেই।

সামরিক দুর্বলতা
সব দিক দিয়েই চীনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমেরিকার চেয়ে দুর্বল। পরমাণু অস্ত্র খাতে চায়নার বর্ধিষ্ণু বিনিয়োগ নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও জনপ্রিয় মত হচ্ছে চীনের অস্ত্রাগারে রয়েছে ২৫০টির মতো পরমাণু অস্ত্র যার অধিকাংশই আমেরিকাতে পৌঁছুতে পারবে না। অন্যদিকে আমেরিকার রয়েছে ৪,৬০০ পরমাণু অস্ত্র যা যে কোনো সময় মিসাইল অথবা প্লেনে বহনযোগ্য। তাছাড়া অস্ত্রাগারে জমা রয়েছে আরো ২,৭০০ অস্ত্র। কেউ কেউ বলেন চীনের এ ছোট পরমাণু প্রতিরোধ ব্যবস্থা এমন ধারণার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যে চীনের আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী।


এখন পর্যন্ত চীনের কোনো নির্ভরযোগ্য সামুদ্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই, নেই বিমান বহনকারী কোন রণতরি। এটার অনেক সাবমেরিনও এখনো ডিজেল ও বিদ্যুৎ চালিত। এসব দিক বিবেচনা করলে এটা পরিস্কার হয় যে যদিও চীন একটি উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তি তবুও সামরিক শক্তির প্রধান ব্যবস্থাগুলোর দিক দিয়ে আমেরিকার কাছাকাছিও নেই। -

0 Response to "চীন কী পারবে আমেরিকাকে পেছনে ফেলতে? "

Post a Comment